
নিজস্ব প্রতিনিধি:
কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার পোড়াদহ রেলস্টেশন সংলগ্ন বিস্তীর্ণ সরকারি জমিকে ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র চাঞ্চল্য, উদ্বেগ আর নানামুখী প্রশ্নের। প্রায় ১২ একর বাংলাদেশ রেলওয়ের মূল্যবান জমি দখলের অভিযোগে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে রেলওয়ের ডিভিশনাল স্টেট অফিসার শফিকুল ইসলামের নাম। স্থানীয়দের দাবি, তার প্রভাব ও প্রত্যক্ষ তদবিরেই দখল কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। এমনকি প্রশাসনের একটি অংশের নীরব সমর্থন নিয়েও উঠেছে গুরুতর অভিযোগ।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত পড়ে থাকা এই জমি হঠাৎ করেই দখলচক্রের নজরে আসে। সম্প্রতি সেখানে ট্রাকের পর ট্রাক মাটি ফেলে ভরাট করা, চারপাশে ঘের নির্মাণ এবং স্থাপনা তৈরির প্রস্তুতি—সবকিছুই প্রকাশ্য দিবালোকে ঘটছে। এত বড় পরিসরের কাজ চোখের সামনে চললেও তা থামাতে কার্যকর কোনো উদ্যোগ না থাকায় সাধারণ মানুষের মনে জন্ম নিয়েছে নানা প্রশ্ন—কার ছত্রছায়ায় চলছে এই দখল?
অভিযোগের তীর সরাসরি শফিকুল ইসলামের দিকে। স্থানীয়দের ভাষ্য, তার প্রভাবেই দখলকারীরা নির্ভয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে মিরপুরের সহকারী কমিশনার (ভূমি) ঈশিতা আক্তারের বিরুদ্ধেও অনিহার অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, “বাংলাদেশ রেলওয়ের সম্পত্তি নিয়ে আমার সরাসরি করণীয় নেই। এ বিষয়ে আদালতে মামলা হয়েছে, আদালতই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবে।” ফলে প্রশাসনের এক অংশের দায় এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা জনমনে আরও সন্দেহের জন্ম দিচ্ছে।
এলাকাবাসীর প্রশ্ন আরও তীব্র—সরকারি জমি নিয়ে মামলা চলমান থাকা সত্ত্বেও প্রশাসনের নাকের ডগায় কীভাবে দিনের পর দিন বালি ফেলে পুকুর ভরাট করে জমি দখল করা হচ্ছে? রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার পরও কেন কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি—এই প্রশ্নও ঘুরপাক খাচ্ছে সর্বত্র।
সচেতন মহল বলছে, রেলের জমি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নয়; এটি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। দায়িত্বপ্রাপ্তদের অবহেলা বা যোগসাজশে যদি এমন সম্পদ দখল হয়ে যায়, তবে তা শুধু অনিয়ম নয়—রাষ্ট্রীয় স্বার্থের ওপর সরাসরি আঘাত।
এদিকে বিষয়টি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে একটি স্বত্বপ্রচার মামলাকে কেন্দ্র করে। কুষ্টিয়ার মিরপুর সিভিল জজ আদালতে বাংলাদেশ রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চল কর্তৃপক্ষ একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলা দায়ের করেছে। মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে, কাটদহ মৌজায় অবস্থিত প্রায় ১২ একর জমি ঐতিহাসিকভাবে রেলওয়ের মালিকানাধীন হলেও ভ্রান্ত রেকর্ডের মাধ্যমে এর বড় অংশ ব্যক্তি মালিকানায় চলে গেছে।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ১৯২১-২২ সালের দিকে ইজারার সুযোগ নিয়ে কিছু ব্যক্তি জমির রেকর্ড নিজেদের নামে করে নেন। পরবর্তীতে সি.এস, এস.এ এবং আর.এস রেকর্ডের ধারাবাহিকতায় সেই ভুল তথ্য বহাল থাকে। বর্তমানে মোট ১২ একরের মধ্যে মাত্র ১.১৫ একর জমি রেলওয়ের নামে সঠিকভাবে রেকর্ডভুক্ত রয়েছে, আর বাকি ১১.২৭ একর জমিই মামলার আওতাধীন।
এই মামলায় স্থানীয় ব্যক্তিসহ মোট ১৮ জনকে বিবাদী করা হয়েছে এবং সরকারের পক্ষে জেলা প্রশাসককেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বাদীপক্ষের দাবি, বিবাদীরা ভ্রান্ত রেকর্ডের ভিত্তিতে ‘ভূয়া স্বত্ব’ দাবি করে রেলওয়ের বৈধ অধিকার বাধাগ্রস্ত করছেন।
আইনজীবী মহলের মতে, এই মামলা শুধু একটি জমির মালিকানা নির্ধারণেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং ভবিষ্যতে এ ধরনের বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।
এদিকে স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়ায় ফুটে উঠেছে উদ্বেগ ও প্রত্যাশার মিশ্র চিত্র। কেউ দ্রুত বিচার ও দখলমুক্তির আশা করছেন, আবার কেউ আশঙ্কা করছেন—দীর্ঘসূত্রতায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
ক্ষুব্ধ এলাকাবাসীর ভাষায়, “প্রকাশ্যে সরকারি জমি দখল হচ্ছে, অথচ কেউ থামাচ্ছে না। এতে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।”
বর্তমানে সবার দৃষ্টি নিবদ্ধ মিরপুর সিভিল জজ আদালতের দিকে। ইতিহাস, দলিলপত্র এবং আইনের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণের মাধ্যমে এখানেই নির্ধারিত হবে জমির প্রকৃত মালিকানা।
এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের আশঙ্কা, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পুরো জমিই দখল হয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিও উঠেছে, যাতে ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় সম্পদ দখলের এমন ঘটনা আর না ঘটে।