নিজস্ব প্রতিনিধি
কুষ্টিয়ার হরিপুর পদ্মার চরে রক্তাক্ত রাত কাকন বাহিনীর হামলায় ওসিসহ ৫ জন নৌপুলিশ সদস্য গুলিবিদ্ধ।পদ্মার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল আবারও রণক্ষেত্রে পরিণত হলো। গভীর রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে কুষ্টিয়ার হরিপুর পদ্মা চরে নৌপুলিশ ও চরমপন্থী কাকন বাহিনীর মধ্যে গোলাগুলির ঘটনায় ওসি সহ পাঁচ পুলিশ সদস্য এবং এক নৌকার মাঝি গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এ ঘটনায় পুরো অঞ্চলে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।মঙ্গলবার গভীর রাতে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ঈশ্বরদীর লক্ষ্মীকুন্ডা নৌপুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা কুষ্টিয়া সদর উপজেলার হরিপুর অংশে পদ্মা নদীতে অবৈধ ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের খবর পেয়ে অভিযানে যায়। অভিযোগ রয়েছে, ঘটনাস্থলে পৌঁছামাত্র কাকন বাহিনীর সশস্ত্র সদস্যরা পুলিশকে জিম্মি করে অতর্কিত শর্টগানের গুলি বর্ষণ করে। মুহূর্তেই শান্ত নদীচর রণাঙ্গনে রূপ নেয়।ছররা গুলিতে ফাঁড়ির ইনচার্জসহ পাঁচ পুলিশ সদস্য এবং একটি নৌকার মাঝি আহত হন। আহতদের দ্রুত উদ্ধার করে প্রথমে ঈশ্বরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে চার পুলিশ সদস্য ও মাঝিকে পাবনা জেনারেল হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। গুরুতর আহত একজনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।নৌপুলিশের রাজশাহী অঞ্চলের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সোহেল রানা এ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে অভিযান চালাতে গিয়েই পুলিশ সদস্যরা এই সন্ত্রাসী হামলার শিকার হন। জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, লালপুরের দিয়ার-বাহাদুরপুরের মোল্লা ট্রেডার্সের এক বছর মেয়াদি বালুমহালের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর হরিপুর পদ্মা চরে বালু উত্তোলন ঘিরে নতুন করে আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। সেই বিরোধ থেকেই পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায় কাকন বাহিনী।দীর্ঘদিন ধরেই পদ্মার চরাঞ্চল সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, মাদক ও অবৈধ বালু বাণিজ্যের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত। বিস্তীর্ণ কৃষিজমি পর্যন্ত এই সশস্ত্র বাহিনীগুলোর অলিখিত নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কৃষকদের জিম্মি করে চাঁদা আদায় থেকে শুরু করে অস্ত্রের মহড়া—সবকিছুই যেন পদ্মার বুকে সমান্তরাল এক অশান্ত জনপদের ইঙ্গিত বহন করে।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈধ বালুমহাল ইজারা কার্যক্রম স্থবির থাকায় অবৈধ বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে অপরাধী চক্রগুলো আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তারই ধারাবাহিকতায় মাঝেমধ্যেই নিজেদের মধ্যে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সশস্ত্র সংঘর্ষে জড়াচ্ছে তারা।উল্লেখ্য, গত ২৭ অক্টোবর ২০২৫ রাজশাহীর বাঘায় সন্ত্রাসী হামলায় তিনজন নিহত হওয়ার পর ‘অপারেশন ফার্স্ট লাইট’ নামে বড় ধরনের অভিযান চালিয়ে বিপুল অস্ত্র, মাদক উদ্ধার এবং বহু সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করা হয়। কিছুদিন পরিস্থিতি শান্ত থাকলেও সাম্প্রতিক এই হামলা প্রমাণ করল, পদ্মার চরাঞ্চলে সন্ত্রাসের শেকড় এখনো গভীর। রক্তাক্ত এ হামলার পর প্রশ্ন উঠেছে—পদ্মার চরে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ কতটা কার্যকর, আর সন্ত্রাসের এই ছায়া থেকে মুক্তি মিলবে কবে? এখন সেই উত্তর খুঁজছে সীমান্তঘেঁষা জনপদ।